কেন পড়ব নৃবিজ্ঞান? নৃবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার || Muhammed Juwel Ahmed

 


ছবি: সংগৃহীতনৃবিজ্ঞান মানুষের বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন। মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত যা যা বিষয় রয়েছে, সেটা হতে পারে পরিবেশ, জলবায়ু, দুর্যোগ, চিকিৎসা, আইন, পাবলিক পলিসি, ব্যবসা, উন্নয়নসহ এমন নানান বিষয় নৃবিজ্ঞানে আলোচনা করা হয়। 

নৃবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা
বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞান বা অ্যানথ্রোপলজি বিভাগ প্রথম যাত্রা শুরু করে ১৯৮৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান পড়ানো হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইউবি উল্লেখযোগ্য।

যা পড়ানো হয়
মানুষ সম্পর্কিত সবকিছু নৃবিজ্ঞানে পড়ানো হয়। নৃবিজ্ঞানের মূল বিষয় দৈহিক নৃবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান, প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান ও ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান। এ ছাড়া আইন, উন্নয়ন, বাস্তুসংস্থান, সাহিত্য, বিশ্বায়ন, আইসিটি, এসডিজিসহ মানবসংশ্লিষ্ট সবকিছুই নৃবিজ্ঞানে পড়ানো হয়। সামাজিক বৈষম্য, লৈঙ্গিক বৈষম্য থেকে বেদে সম্প্রদায়, হিজড়া সম্প্রদায়, এমন বিষয়ও বিভাগটির আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

বৈচিত্র্যময় বিষয়
নৃবিজ্ঞান একটি বৈচিত্র্যময় বিষয়। যেহেতু বিভাগটি মানুষকে নিয়ে কাজ করে, একজন শিক্ষার্থী যখন বিষয়টি সম্পর্কে পড়বেন তখন তিনি মজা পাবেন এই কারণে যে তিনি নিজেকে নিয়ে পড়ছেন। এখানে আত্তীকরণের একটা বিষয় রয়েছে। অন্য যেকোনো বিভাগের তুলনায় নৃবিজ্ঞানে এই সুযোগ বেশি রয়েছে। নৃবিজ্ঞান পড়ে এক ধরনের অ্যাপ্রোচ তৈরি হয়, যার কারণে সে অন্যকে ছোট করে দেখবে না, বরং অন্যকে সম্মান করবে। এই অ্যাপ্রোচের কারণে সে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘিষ্ঠ—এটা চিন্তা করে না। সে প্রত্যেক মানুষকে স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্ব দিতে চায়, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে, বুঝতে পারে পুরুষতন্ত্র কীভাবে চেপে বসে, বুঝতে পারে সমাজে বৈষম্য কীভাবে তৈরি হয়। এর কারণে মানসিকভাবে তার দীর্ঘদিনের একরৈখিক চিন্তার পরিবর্তন হয়। তারা মাইক্রো লেভেল থেকে চিন্তা করতে পারেন, কানেকশনগুলো বুঝতে পারেন, সামগ্রিকভাবে কাজ করেন। এবারে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট সুভান্তে প্যাবো 

বিদেশে উচ্চশিক্ষা
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটা বড় সুযোগ রয়েছে এ বিভাগে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য। বিগত এক শ বছর, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী বহুল চর্চিত একটি বিষয় হচ্ছে নৃবিজ্ঞান। সামাজিক বিজ্ঞান পড়ানো হয় বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা এমন প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নৃবিজ্ঞান পড়ানো হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, টরন্টো ইউনিভার্সিটি, আপসালা ইউনিভার্সিটি, হেলসিংকি ইউনিভার্সিটি উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৃবিজ্ঞানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে।

কাজের সুযোগ
নৃবিজ্ঞানে রয়েছে বিস্তৃত আলোচনার জায়গা, কাজ করার সুযোগ। যেহেতু প্রতিটি জায়গা বা প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রই মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে অ্যানথ্রোপলজিস্ট কাজ করতে পারেন না। সেটা একটা কোম্পানি হতে পারে, ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন হতে পারে, ভলান্টারি অর্গানাইজেশন হতে পারে, করপোরেট সেক্টর হতে পারে, হতে পারে চলচ্চিত্র। অ্যাভাটার মুভিটিতে যে কালচার দেখানো হয়েছে, সেই অ্যানালাইসিসের জন্য অ্যানথ্রোপলজিস্ট কাজ করেছেন। একজন সফটওয়্যার ডেভেলপারও একজন অ্যানথ্রোপলজিস্টকে হায়ার করে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত পরিধির এই বিষয়ের ভবিষ্যৎও ততটাই মজবুত। এমন নয় যে প্রযুক্তিনির্ভর সোসাইটি হওয়ার কারণে বিভাগটি এর গুরুত্ব হারাবে। বরং চাহিদা আরও বাড়বে, ইতিমধ্যে বহির্বিশ্বে তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সময়োপযোগী পরিসর
এসডিজির একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে আমরা কাউকে পেছনে ফেলে যাব না, আমরা সবাইকে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ প্রত্যেক মানুষের কাছে আমরা পৌঁছাতে চাই। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলা বা স্মার্ট বাংলাদেশ তখনই সম্ভব, যখন সবাইকে নিয়ে চলতে পারবে এবং সবাইকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। সেই মানুষটি স্মার্ট যিনি সব জায়গায়, সব ক্ষেত্রে খাপ খাওয়াতে পারেন, নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের এ সুযোগ রয়েছে। নৃবিজ্ঞানীর শিক্ষার্থীরা যেহেতু ফিল্ডে যান, ফিল্ডে কাজ করেন, ফিল্ডের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাই ফিল্ডওয়ার্ক করার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে বা মাঠপর্যায়ে কাজ করার তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তিনি প্রতিটি জায়গায় খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা রাখেন। আর এই সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই তাকে এগিয়ে রাখবে। একই সঙ্গে যেহেতু আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীও মানুষের সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকবে, সেখানেও নৃবিজ্ঞান সমানতালে কাজ করে যাবে। এখন আমরা আর্টিফেকটস নিয়ে কাজ করছি, তখন হয়তো টেকনোলজিক্যাল আর্টিফেকটস নিয়ে কাজ করব। উভয় বিষয়ই মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত, মানুষের ব্যবহার্য, আমরা উভয়কে নিয়েই কাজ করব। আর মানুষ যেখানে থাকবে, সেখানে নৃবিজ্ঞানের আলোচনার সুযোগ থাকবে। 



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url