আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিলান্সিং করছি, তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই সংগ্রামের কাহিনী আছে। কিন্তু লোক লজ্জা হোক, বা অন্য কোন কারনেই হোক আমরা এসব প্রকাশ্যে বলি না। ফলে বাহিরে একটা ধারণা হয়ে গেছে যে, আবার অনেকেই বলেন যে, একটা পিসি আর নেট কানেকশন থাকলেই সবাই ফ্রিল্যন্সার, আর খালি ডলার আর ডলার। আর এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা প্রতারনার, রমরমা বাণিজ্য করে যাচ্ছে। আমার মনে হয় কারো কোন গল্প থাকলেই বলে ফেলা উচিৎ।
অনেক ভাই বোনরা মনে করেন,একটা পিসি আর নেট কানেকশন থাকলেই হল,যে কেউ ফ্রিলান্সার হতে পারবে, বিষয়টা আসলে তা নয়। একেকজন ফ্রিল্যন্সার হচ্ছে একেক জন যোদ্ধা। হাজারো বাঁধা পেরিয়ে, অনেক সাধনার পরে একজন তৈরি হয়। এই বন্ধুর যাত্রায় কতজন যে ঝড়ে পড়ে, তার কোন হিসাব নেই। আমরা শুধু সাফল্যই দেখি, এর পিছনের কষ্টের কাহিনী আমরা জানি না। আমিও একজন ফ্রিল্যান্সার হয়ে গর্বিত একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা,সামান্য কিছু বৈদেশিক মুদ্রা হলেও, দেশে আনার মাধ্যমে, দেশের উন্নয়নে কিছুটা হলেও ভুমিকা রাখি ইনশাআল্লাহ । তবে আমার চলার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বলা যায় সেটা ছিল এক ভয়ংকর আর অনিশ্চিত যাত্রা।
ফ্রিল্যান্সার হিসাবে যাত্রা হয় যেভাবে।
ইন্টারনেট থেকেই সারারাত বিভিন্ন ওয়েব সাইট এর আর্টিকেল গুলো পড়তে থাকলাম এবং YouTube থেকে অনেক ভিডিও টিওটোরিয়াল ডাউনলোড করে কাজ শিখতে থাকলাম। তারপর 2018 March থেকে একের পর এক কাজ পেতে থাকলাম Odesk, elance, Guru সাইট থেকে। ওয়েব-ডেভেলপার দিয়ে শুরু, তারপর আরটিকেল রাইটার, আস্তে আস্তে মার্কেটিং এভাবেই আমার ফ্রিল্যান্সিং এর যাত্রা শুরু। 10000+ hours worked+ 101 জব শেষ করছি। UPWORK : 129 jobs, Fiverr : 540 project completed,এছাড়াও 2013 থেকে কাজ করছি মার্কেটপ্লেস এর বাহিরে সরাসরি ৪টা Canada,Australia,America,France এর ক্লায়েন্টের সাথে।পাশাপাশি নিজের কাজ অন্যদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছি Belancer থেকে যার বেশিরভাগই বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার এবং নতুনদের কাজ শিখিয়ে সাহায্য করতেছি ।
আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, লেখাপড়া পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ওয়েব ডিজাইনের কাজ করে থাকি, ৫/৬ বছর ধরে আমি অনলাইন প্লাটফর্মে আছি, তারপর পর থেকেই বিভিন্ন ঘাটাঘাটি করে একটি রাস্তা পেলাম ফ্রিল্যান্সার হওয়ার জন্য, ২/৩ বছর যাওয়ার পর আমি একজন সফল ফ্রিলান্সার হয়ে গেলাম,
মূলত আমার টার্গেট ছিলো আমি নিজে কিছু করার জন্যে, এবং লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সহ পরিবারের খাবার যোগান দেওয়ার জন্য , আমাদের খাওয়া এবং পড়ার তেমন কষ্ট না থাকলেও, পরিবারে প্রাচুর্য ছিল না। তবে স্কুলে যে বয়সে সবাই আড্ডা আর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকতাম, সেই বয়সে আমি ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে ব্যাস্ত থাকতাম। বিষয়টা আর কিছুই না, যদি পরিবারে একটু উন্নতি হয় আর পরিবারের সন্তানদের উপর অনেক দায়িত্ব থাকে। এই নিয়েই তো পথ চলা ।
পড়াশোনায় ছন্দপতন
আসলে আমার তেমন কোন স্বপ্ন ছিল না। মাথায় একটা কথাই গেঁথে গিয়েছিল, আর সেটা হচ্ছে, পড়াশোনা শেষ করে, যে করেই হোক, একটা চাকরি জুটিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে হবে।
মেধাবী ছাত্র ছিলাম,সব সময় ক্লাসে ফাস্ট সেকেন্ডের মধ্যে থাকতাম। কিন্তু এসব সমস্যার কারনে পড়াশোনায় অনেক ব্যাহত হয়েছে। জে.এস সি/এস এস এসসি পরীক্ষায় অনেক ভাল রেজাল্ট করেছিলাম । খেয়াল ছিলো ভালো একটা কলেজে ভর্তি হবো, সেটা আর হলো না । কি আর করার, শহরের কলেজে অনার্সে ভর্তি হলাম। কিন্তু পড়াশোনা আর শেষ হয় না। অনার্সের চার বছরের কোর্স ছিল। কোভিড ১৯ এর কারনে, অনার্স শেষ করতে পারলাম না । যেখানে ২০২২ সালে অনার্স শেষ হওয়ার কথা সেখানে আমি এখনও ৪য় বর্ষে পড়ে আছি, এই বিষয় নিয়ে আমি কিছুই বলবো না, যেহেতু এটা বাংলাদেশ । আর বাংলাদেশের এডুকেশন এর ব্যবস্থাপনার কথাই তো আপনারাই জানেনই? এসব নতুন কিছু না ।
এবার শুধু এগিয়ে যাওয়া
আমি কিন্তু,আমার শপথের কথা ভুলে যাইনি। ২০১৮ সালের শেষের দিক থেকেই বিভিন্ন ফ্রিলান্সিং বিষয়ক ফেসবুক গ্রুপে, লেখালেখি শুরু করতে লাগলাম। উদ্দেশ্য আর কিছুই না। নতুনদেরকে একটা গাইডলাইন দেয়া, যেন কেউ আমার মত ভুল না করে। সেই লেখালেখি এখন পর্যন্ত চালু আছে। প্রতিদিন প্রচুর মানুষের মেসেজ পাই। চেষ্টা করি সবার মেসেজের উত্তর দেয়ার,যথাসাধ্য হেল্প করার চেষ্টা করি। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে, ইনকাম কমে যেতে লাগল। কারন এই ধরনের কাজ আরও অনেকেই করে, ফলে প্রতিযোগিতা বাড়তে লাগল। ততদিনে আমার অনলাইনে মোটামুটি ভাল অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। অনলাইন থেকে শিখে শিখে, নিজেকে আপগ্রেড করতে লাগলাম। গ্রাফিকস এর ভিন্ন ধরনের সার্ভিস দিতে শুরু করলাম। ইনকাম আবার বাড়তে লাগল। দিন নেই রাত নেই কাজ করে যেতে লাগলাম। এমনও হয়েছে যে,সপ্তাহের একদিনও আমি বাসা থেকে বের হইনি। । নিজের ভবিষ্যৎ এর লক্ষ্য ঠিক করলাম।
নিজের আত্মপরিচয় তৈরি
আমরা যারা প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সিং করি, তাদের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা আত্মপরিচয় সমস্যায় ভুগি। এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগি। কারন আমাদের সমাজ এখনো আমাদের ব্যাপারে ভাল মত অবগত না। ফলে যেটা হয় প্রায় সময় আমাদের ব্যাপারে সবাই ভুল বোঝে। মনে আছে আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলেকে যখন প্রথমে স্কুলে ভর্তি করি তখন তাকে একজন জিজ্ঞেস করল তোমার চাচা কি করে। সে বলল চাচ্চু কম্পিউটারে বসে বিদেশে কাজ করে। তখন বলল তোমার চাচার ফটোকপির দোকান কোথায়? মানে তারা মনে করেছে আমি মনে হয় ফ্লেক্সিলোড বা ফটোকপি কম্পোজের কাজ করি যাই এইদিকে আমি গেলাম না আর । ফেইসবুকে কোন ফ্রিল্যান্সারের প্রোফাইল দেখতে দেখবেন প্রায়ই ইনকামের স্ক্রিনশট, নিজের কাজের যায়গার ছবি, গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের সাথে তোলা ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে সে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগছে। চাইছে মানুষ যেন বোঝে সে কি কাজ করে।
আমার এই ধরনের সমস্যা কোন দিন ছিল না। বছরের পর বছর ঘরে বসে কাজ করেছি। কিন্তু এক সময় বুঝলাম, আমার নিজের আত্মপরিচয় তৈরি করতে হবে। এই সমাজে কেউ জায়গা দেয় না। যায়গা করে নিতে হয়। উদ্দেশ্য নিজের আত্মপরিচয় তৈরি করা এবং এলাকার বেকার যুবক যুবতীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করা। এখন অনেকেই আমাকে চেনে, সম্মান করে, আমি আমার আত্মপরিচয় সৃষ্টি করতে পেরেছি। ইভেন আমার আন্ডারে অনেকেই কাজ করে, তারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং পরিবারের খাবার যোগানের ব্যবস্থা করেছে, এক কথায় বলতে গেলে, অনেকেই নিজেকে একজন সফল ফ্রিলান্সার হিসেবে বলতে পারছেন ।
ছোট একটু ছন্দপতন
সব কিছুই ভালই চলছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ৭৫০০ রিভিউ সহ আমার ফাইবার একাউণ্ট সামান্য কারনে ব্যান হয়ে গেল। অনেক কষ্ট পেলেও ভেঙ্গে পড়িনি। আগেই বলেছি একজন ফ্রিলান্সার হচ্ছে যোদ্ধা। আমি এত যুদ্ধ করে এতদুর এসেছি যে, এতে আমি মোটেও ভয় পাইনি। নতুন উদ্যমে শুরু করলাম। আপওয়ার্কে কাজ শুরু করলাম। পাশাপাশি আবার Fiverএ কাজ শুরু করলাম। আস্তে আস্তে আমার আগের জায়গা অনেকটাই উদ্ধার করলাম। বর্তমানে আপওয়ার্কে টপ রেটেড এবং ফাইবারে লেভেল-৩ হিসেবে আছি। ২০২১ তে আমার নিজের সার্ভিস সাইট চালু করি। উদ্দেশ্য সরাসরি আর্টিকেল লেখালেখি করেই মাসে যাতে যে কেউ ২০/৩০ হাজার টাকা ইনকাম করতে পারছেন, অনেকেই আবার একটু বেশি কম, তবে তাদের মাধ্যমে আমার পারসেন্টিজ আছেই । আমার আন্ডারে এখনও মোট এমপ্লয়ি ২০ জনের অধিক আছে, ইচ্ছা আছে সামনে আরও বাড়ানোর।
আমি এখন স্বাধীন
আমি বিশ্বাস করি একজন মানুষ বড় হতে পারে, তার স্বপ্নের সমান। আমি স্বপ্ন দেখি আরও বড় কিছু করার। যে চাকরীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে দাসত্বের জীবন বেছে নিয়েছিলাম ফ্রিলান্সিং আমাকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছে। যে স্বাধীনতার স্বাদ আমি পেয়েছি, সেটা এই ফ্রিলান্সিং এই সম্ভব। নিজের মেধার সর্বোত্তম ব্যাবহার করতে পারছি, যেটা আমি চাকরীতে করতে পারতাম না। আমি সেই ২০১৪ সাল থেকেই কম্পিউটার ব্যাবহার করে কাজ করতাম। আমি কি করি সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকি,আমার কম্পিউটারের কাজ নিয়ে সবাই হাসি ঠাট্টা করত। আমার নাম দিয়েছিল “ফরম্যাট ম্যান”। কখনোই কম্পিউটারের দিয়ে কাজ করতে উৎসাহ পাইনি। অথচ এখন এটাই আমার জিবিকার মাধ্যম।
ফ্লিল্যান্সিং-এর প্রথম কাজ আর আপনার অনুভূতি যদি বলতেন ।
জীবনের প্রথম কাজ ছিল ওয়েবসাইট ডিজাইন ,জীবনের প্রথম কাজ করে টাকা পাইনি কারন কাজ টা জমা দিতে দেরী হওয়ার বাইয়ার টাকাটা দেয়নি ।জবটাও ছিল Fixed price ।সেদিন থেকে নাকে হ্মত দিলাম আর Fixed price job করবোনা। তাই Hourly job করার জন্য যা যা করতে হয় করব। তাই web developer হওয়ার ইচ্ছে ছেড়ে মাকেটিং সেক্টরে কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলাম। আমার ভালো বন্ধু Google এর সাহায্য জন্য হাত বারালাম।
জীবনের প্রথম কাজ করে টাকা পাইনি। যখন অন্য ক্লায়েন্টের কাজ করে টাকা পেলাম সেই টাকা তুলতে অনেক সমস্যাই পড়ি ব্যাংকে SWIFT CODE আনতে যেয়ে SWIFT CODE কি তাই অনেক ব্যাংকার জানেন না। Payoneer মাষ্টারকার্ড পেয়েছিলাম অনেক কষ্টে আর মানিবুকার্স এর লেটারও পাইনি, পোস্ট অফিস এ অনেক ধর্না দিয়েও কোন লাভ হয় নি, যাই হোক সমস্যার কথা বলে শেষ করতে পারব না।
ফ্রিল্যান্সিং পেশাটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
আসলে ফ্রিল্যান্সিংটা কে পেশা নয় নেশা হিসাবে নিতে হবে। এখানে প্রতিনিয়ত আপনাকে নতুন কিছু জানার আর শিখার আগ্রহ থাকতে হবে। পেশাতে আপনার বিরক্তি থাকতে পারে, কিন্তু নেশা এমন একটা জিনিস যা প্রতিদিন আপনাকে নতুনের দিকে নিয়ে যাবে। এখানে কি করে টাকা আয় করা যায় তা ভাবলে হবে না, আপনাকে চিন্তা করতে হবে কি করে আপনি আরো ভাল কাজ শিখতে পারেন। এই ভাল কাজই আপনাকে আপনার লক্ষ্যে নিয়ে যাবে।
গ্রামের উন্নয়নে ভুমিকা রাখা:
যেহেতু গ্রামেই থাকি তাই আমার ইচ্ছা, আমার নিজের গ্রামের যুব সমাজকে নিয়ে কাজ করার। আমাদের সব কিছুই এখন শহর কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের দিকেও আমাদের নজর দেয়া উচিৎ। ২০২০ সালে ১০ জন বেকার যুবক যুবতীকে আমার বাসায় থেকে সম্পূর্ণ বিনামুল্যে ২ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ দিয়েছি । প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল গ্রাফিক্স ডিজাইনিং এবং ফটো এডিটিং। শুধু তাই নয় এর মধ্য থেকে ০৬ জনের কর্মসংস্থান করি, তারা এখন মুঠামুঠি স্বচ্ছল, আবার ২০২১ সালে নতুন ১৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেই। ইচ্ছা আছে সবার কর্মসংস্থান করা। আমাদের গ্রামে ২০২২ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত প্রোগ্রাম আমরা স্পন্সর করি। এছাড়া আরও সমাজসেবা মূলক কাজ করছি।সেগুলো বলে নিজেকে জাহির করতে চাই না।
নিজের আরেকটি বড় পরিচয়
আরও কিছু না লিখলে এই লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। সেটা হচ্ছে একজন ফ্রিল্যন্সার হবার পাশাপাশি আমি একজন লেখক। ছোট বেলা থেকে আমার প্রচুর পড়ার অভ্যাস। সাথে লেখালেখি। সেই ছোট বেলা থেকেই আমি ডায়েরী লিখি। এর বাহিরে অনেক গল্প কবিতা লিখেছি। কিন্তু কোন দিন কারো সামনে বলার সুযোগ হয়নি। কোথায় ছাপাও হয়নি। কিন্তু বর্তমানের এই অনলাইন জামানায়, লেখালেখি করা এবং প্রকাশ করা এবং হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছানো অনেকটাই সহজ। তাই সময় পেলেই আমি লেখালখি করি।
আমার এই লেখালেখি একাকীত্ব কাটানরও মাধ্যম। আমি গ্রামে থাকি। এখানে আমার মত মনমানসিকতার মানুষ কম। ফলে অনেকের মাঝে থেকেও আমি একা। তাই সময় পেলেই লিখি। অনেকের কাছেই সেটা পৌঁছে যায়। তাদের কমেন্ট পড়ি । তাদের সাথে এক ধরনের হৃদ্যতা অনুভব করি। কোন কারনে মন খারাপ হলেই, লেখালেখি শুরু করে দেই। এছাড়া একটা দায়বদ্ধতাও আছে, যেটা আগেই বলেছি। মুলত ইনফরমেটিভ, গাইডলাইন এবং মোটিভেশনাল লেখা বেশি লিখি। আমার লেখার সব থেকে বড় ভক্ত আমি নিজেই। একটা লেখা ওয়েব সাইটে পাবলিশ করার পরে নিজেই যে কতবার পড়ি তার কোন হিসাব নেই। এ এক ধরনের আত্মপ্রেম বলা চলে। এই লেখালেখি থেকে আমার প্রাপ্তিও কম না। এই লেখার সুত্র ধরে অনেকের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, আবার অনেকের চোখে বিশেষ করে অনেক নতুনদের কাছে আমি সেলিব্রেটি। ফেসবুকে আমার ৫ হাজার ফ্রেন্ডলিস্ট পুরা হয়েছে সেই ২০১২ সালেই। ফলোয়ারের সংখ্যাও প্রায় ১ লাখের উপরে হবে । অর্থাৎ অন্তুত ১ লাখের উপরে মানুষের কাছে আমি পৌঁছাতে পেরেছি। সত্যি বলতে এই জনপ্রিয়তা আমি উপভোগ করি।
কিছু প্রাপ্তিলাভের গল্প
কয়েকটি ঘটনা শেয়ার করি ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সুদূর ফ্রান্স থেকে এক বাংলাদেশি বোন, চিটাগাং এর আমাকে একজন ফোন দিয়ে জানিয়েছিল সে আমার লেখার অনেক ভক্ত। আমার লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সে ঠিক করেছে সে দেশে চলে আসবে এবং আমার সাথে দেখা করবে । কারন সেখানে সে অনেক খারাপ পজিশনে আছে। আমি তাকে এটা না করতে অনেক বুঝালাম। প্রায় মাস খানেক পরে আবার কল। এখন সে বাংলাদেশে। আমি পুরাই অবাক। বর্তমানে সে অনেক ভাল পজিশনে আছে। তার বর্তমান ইনকাম প্রায় মাসিক ১০০০/১৫০০ ডলার ছিল। আমি এর ক্রেডিট নিচ্ছি না। তবে তার শুরু করার অনুপ্রেরণা ছিলাম আমি।
একজন সফল ফ্রিল্যান্সার এবং যার একটি আইটি ইন্সটিটিউট আছে সে একদিন আমাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছিল যে, আমার কোন লেখা পাবলিশ হলে, সেটা ক্লাসের প্রজেক্টরে বড় করে পড়া হয়। সবাই অনেক অনুপ্রেরণা পায়। আরেকজন আমাকে বলছিলম সে আমার সব লেখা প্রিন্ট করে ফাইলে রেখে দেয়। সময় পেলেই পড়ে। এটা থেকে সেও অনুপ্রেরণা পায়। আমি ঘরকুনো টাইপের লোক। ঘরে থেকে খুব একটা বের হই না। সিলেট পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট একবার এক প্রোগ্রামে গেলাম। আমাকে দেখে, দেখি সবাই সেলফি তুলতে ব্যাস্ত। নিজেকে অনেক সেলিব্রেটি সেলিব্রেটি মনে হচ্ছিল। সেদিনের আমার ফেসবুক ওয়ালে দেখি আমার ছবি আর ছবি। প্রতিদিন অন্তত ২০/৩০ জনের সাথে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে কথা বলতে। চেষ্টা করি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে তাদের হেল্প করার। যখন দেখি তার সমস্যার সমাধান হয়েছে তখন খুবই ভাল লাগে।
ফ্রিল্যান্সিং-এ নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
অর্থনৈতিক ও কর্মস্বাধীনতার জন্য ফ্রিল্যান্সিং খুবই কার্যকরী। বেকার থাকার দিন এখন শেষ। আপনি যদি একজন ভাল ফ্রিল্যান্সার হতে চান কম্পিউটার সম্পর্কিত বিভিন্ন স্কিল অর্জন করুন। যে কাজটা আপনি সবচেয়ে ভাল পারেন সে কাজের জন্য বেশী করে বিড করুন। বিড করে কাজ না পেলেও হতাশ হবেন না। চেষ্টা করতে থাকুন। সাফল্য আপনি পাবেনই। আর, আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটাকে মনে হয়েছে তা হলো সততা ও সময়মত কাজ সম্পাদন করা। ধরা যাক, ক্লাইন্টের সাথে আপনার কথা হয়েছে যে ৭ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করবেন। আপনি অবশ্যই চাইবেন ৭ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে। আর যদি মনে হয় ৭ দিনের মধ্যে কাজটি শেষ করতে পারবেন না তাহলে আগে থেকেই আপনার ক্লাইয়েন্টকে জানিয়ে রাখুন যে আপনার আরো বেশী সময় দরকার। কখনোই টাইম ট্রেকার অন রেখে অযথা সময় নষ্ট করবেন না। ধরা পড়ে যাবেন এবং জবটা ও হারাবেন। নেগেটিভ ফিডব্যক ও পেতে পারেন এর ফলে। আর, ভালো ফিডব্যক এর জন্য ক্লাইয়েন্ট এর সাথে সুন্দর সম্পর্ক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ন। আমাদের তরুণদের প্রবলেম হচ্ছে আমরা কোন কষ্ট ছাড়াই অনেক কিছু পেতে চাই। আর এখন আমি জানি যে ফ্রিল্যান্সিং জগতে কষ্ট ছাড়া কোন কিছুই অর্জন করা সম্ভব না। অর্থনৈতিক ও কর্মস্বাধীনতার জন্য ফ্রিল্যান্সিং খুবই কার্যকরী। বেকার থাকার দিন এখন শেষ। আপনি যদি একজন ভাল ফ্রিল্যান্সার হতে চান ইংরেজী তে ভালো দহ্মতা থাকতে হবে এবং কম্পিউটার সম্পর্কিত বিভিন্ন স্কিল অর্জন করুন। ফ্রিল্যান্সিং এমন একটি জায়গা যেখানে অল্প শিখে টিকে থাকা যায়না। আপনি প্রতিযোগিতা করবেন পৃথিবীর অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সাদের এর সাথে।আপনার প্রোফাইল টা সুন্দর করে সাজান। পোটপোলিও এড করুন, যে কাজটা আপনি সবচেয়ে ভাল পারেন সে কাজের জন্য বেশী করে বিড করুন।বিড করার সময় খেয়াল করুন ক্লায়েন্ট কি চেয়েছে। গদবাদা কভার লেটার কপি পেস্ট করবেন না। বিড করে কাজ না পেলেও হতাশ হবেন না। চেষ্টা করতে থাকুন। সাফল্য আপনি পাবেনই। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটাকে মনে হয়েছে তা হলো সততা ও সময়মত কাজ সম্পাদন করা। অধিকাংশ ক্লায়েন্টই প্রফেশনাল এবং ভালো লোক খোজে কাজ করানোর জন্য। যার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে কাজ করানো যাবে, যদি আপনি খারাপ রেটিং পান, সেটা UPWORK হোক আর যেখানেই হোক, হয়তো ক্লায়েন্টের মেসেজের দ্রুত রিপ্লাই দেন নাই বা তার সাথে যোগাযোগ ঠিকমত রাখতে পারেন নাই, কিংবা তাকে ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারেন নাই, তাই খারাপ রেটিং পেয়েছেন। ভালো রেটিং পাওয়া খুবই সহজ, তার প্রধান কারন, সব ক্লায়েন্টের সাথেই সম্পর্ক ভালো রাখা আর খুব ভালো কমিউনিকেশন ।
ফ্রিল্যান্সিং করতে গিয়ে অনেকে নানান সমস্যায় পড়ে, এর থেকে সমাধান কি করে পেতে পারে? আপনার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলুন।
সব সময় ভাল রেটিং পেতে হলে যা করতে হবেঃ
* কাজ নেয়ার আগে চিন্তা করবেন কাজটা আপনি করতে পারবেন কিনা।
* ক্লায়েন্ট আপনাকে কোন মেসেজ পাঠালে সাথে সাথে মেসেজ এর রিপ্লাই দেয়ার চেষ্টা করবেন, এতে সে আপনার উপর ভরসা করবে।
* কাজ কোন সমস্যা হলে আগে ক্লায়েন্টকে জানাবেন, আগেই বন্ধু বান্ধব বা বড় ভাইদের জিজ্ঞেস করবেন না, ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলে সমাধান আনতে না পারলে প্রফেশনাল ফ্রীল্যান্সারদের সাহায্য নিন।
* ক্লায়েন্ট এর মেসেজের রিপ্লাই ফাস্ট দিতে হলে আপনাকে একটু পর পর মেইল চেক করতে হবে। আর সারাক্ষন তো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার এর সামনে বসে থাকা সম্ভব না, তাই ভালো ভাবে মেইল চেক করা যায় এরকম একটি মোবাইল ফোন ব্যাবহার করতে পারেন, বর্তমানে খুব কম দামে ভালো ভালো এন্ড্রয়েড ফোন কিনতে পাওয়া যায়।
কখনোই টাইম ট্রেকার অন রেখে অযথা সময় নষ্ট করবেননা। ধরা পড়ে যাবেন এবং জবটা ও হারাবেন। নেগেটিভ ফিডব্যক ও পেতে পারেন এর ফলে। আর, ভালো ফিডব্যক এর জন্য ক্লাইয়েন্ট এর সাথে সুন্দর সম্পর্ক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ন।
সবার শেষে আপনাকে বলতে চাই , আপনার ব্যক্তিগত দিক থেকে ফ্রিল্যান্সিং ও আপনার কিছু কথা যদি শেয়ার করতেন।
পরিশেষে, নিজের উপর আস্থা ও বিশ্বাস মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়। জীবনের সবচেয়ে বড় জয় হলো এমন কিছু করে দেখানো যা সবাই ভেবেছিল তুমি কখনোই করতে পারবেনা। আমি এটাই বলতে চাই যে ফ্রিল্যান্সিং আমার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, ব্যাক্তিগত ভাবে স্বাধীন, পরিবারকে সময় দিতে পারি শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং এর কল্যানে। আমি কৃতজ্ঞ আমার পরিবারের কাছে যারা আমায় সহ্য আর সাহায্য দুটোই করতেছে। আমার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করলেও ঋণ শোধ হবে না!
প্রতিটা মানুষ তার কাজের স্বীকৃতি পেতে চায়, আমি ও তার ব্যতিক্রম নই, আমি হয়তো ৯-৫ টার চাকুরী করতেই পারতাম, তখন আমায় কিছু মানুষ চিনতো, তার সংখ্যা থাকতো নগন্য কিন্তু আমি যে পেশায় আছি , হয়তো আমায় ব্যক্তিগত ভাবে চেনেনা , কিন্তু নামে অনেকেই আমায় চেনে, এটা আমার কাছে এই জীবনে অনেকটা পাওয়া। সরকারি পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়া আমি অন্য কোনও জবে জীবনেও কোনোদিন পেতাম বলে মনে হয়না কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং-এর কল্যাণে অনেক অল্প সময় নিজের কাজের স্বীকৃতি,সম্মান দুটোই আমি পেয়েছি। বাংলাদেশ আইসিটি ডিভিশনের “বেস্ট ফ্রিল্যান্সার অ্যাওয়ার্ড ২০২২ তে অ্যাওয়ার্ড” অর্জন করলাম, আলহামদুলিল্লাহ’। সরকারিভাবে কাজের সম্মাননা পাওয়া উৎসাহমূলক আমার জন্য এবং সেই সাথে সবার জন্য।সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন ,ভবিষ্যতে দেশ ও জাতিকে যাতে আমার ভালো কাজের মাধ্যমে কিছু দিতে পারি। নতুন দের কাছে একটাই অনুরোধ কাজ শিখে মার্কেটপ্লেস আসুন। আপনি কাজ না, কাজই আপনাকে খুঁজবে, যদি আপনি ভালো কাজ পারেন।
পরিশেষে, আমি এটাই বলতে চাই যে ফ্রিল্যান্সিং আমার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন শুধুমাত্র ফ্রিল্যান্সিং এর কল্যানে। একজন মানুষ হিসেবে আমি যেমন বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসীদের কষ্টার্জিত টাকা গ্রাহকের হাতে তুলে দেই, তেমনি আমি নিজেও দেশে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করি এবং এভাবেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়তা করি । আমি একজন গর্বিত বাংলাদেশী। আমি একজন গর্বিত ফ্রিল্যান্সার।